এই আর্টিকেলে আমরা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) লোনের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আলোচনা করব। কীভাবে লোনের পরিমাণ নির্ধারিত হয়, বিভিন্ন ধরনের লোনের সীমা, সুদের হার, আবেদন প্রক্রিয়া, যোগ্যতা এবং সাধারণ প্রশ্নোত্তর (এফএকিউ) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি কৃষকদের জন্য সহজবোধ্য এবং ব্যবহারিক তথ্য প্রদান করবে, যাতে আপনি সহজেই লোন পাওয়ার পথ খুঁজে পান।
Table of Contents
বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য স্থাপিত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) একটি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক, যা ১৯৭৩ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত কৃষি অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়। এই ব্যাংকটি কৃষকদের সস্তা সুদে লোন প্রদান করে বাড়ি-ঘর, সেচ, শস্য চাষ এবং লাইভস্টকের মতো খাতগুলোতে সহায়তা করে। বর্তমানে বিকেবির শাখা সারাদেশে ছড়িয়ে আছে, এবং এটি কৃষি ঋণের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কৃষি লোনের ক্ষেত্রে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ করে। লোনের পরিমাণটি আপনার চাষের আকার, প্রকল্পের ধরন এবং আয়ের উপর নির্ভর করে। সাধারণত, ছোট কৃষকদের জন্য ১ লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে বড় প্রকল্পের জন্য কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত লোন পাওয়া যায়। এখানে আমরা বিস্তারিত জানব কীভাবে এই লোনগুলো কাজ করে এবং কত টাকা পাওয়া সম্ভব।
কৃষি ব্যাংকের লোনের ধরনসমূহ
বিকেবি বিভিন্ন ধরনের কৃষি-সম্পর্কিত লোন প্রদান করে, যা কৃষকদের চাহিদা অনুসারে ডিজাইন করা। এই লোনগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকদের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। নিচে কয়েকটি প্রধান ধরনের লোনের বিবরণ দেওয়া হলো:
- শস্য ঋণ: ধান, গম বা অন্যান্য শস্য চাষের জন্য। এটি সার্বিক্ষণিক ঋণ, যা ফসলের উৎপাদন পরিকল্পনা অনুসারে দেওয়া হয়।
- মৎস্য ঋণ: পুকুর বা জলাভূমিতে মাছ চাষের জন্য। পারিবারিক স্কেল থেকে বাণিজ্যিক স্কেল পর্যন্ত।
- লাইভস্টক ঋণ: গরু, ছাগল বা মুরগি পালনের জন্য। উন্নত জাতের পশু ক্রয়ে সহায়তা করে।
- সেচ ও যন্ত্রপাত ঋণ: টিউবওয়েল বা ট্রাক্টর কেনার জন্য। এটি দীর্ঘমেয়াদী লোন।
- ক্লাস্টারভিত্তিক ঋণ: একাধিক কৃষকের গ্রুপের জন্য, যা ২০ হাজার কোটি টাকার সিএমএসএমই প্যাকেজের অংশ।
এই লোনগুলোর মাধ্যমে কৃষকরা তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারেন এবং আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন।
আরও জানতে পারেনঃ
কৃষি ব্যাংক কত টাকা লোন দেয়: সীমা এবং নিয়ম
কৃষি ব্যাংক কত টাকা লোন দেয় – এটি আপনার প্রশ্নের মূল অংশ। লোনের পরিমাণটি প্রকল্পের ধরন, কৃষকের আয় এবং জমির পরিমাণের উপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের কৃষি ঋণ নীতিমালা অনুসারে, সাধারণত নিম্নলিখিত সীমা রয়েছে:
| লোনের ধরন | সর্বনিম্ন পরিমাণ (টাকা) | সর্বোচ্চ পরিমাণ (টাকা) | সুদের হার (%) | মেয়াদ (বছর) |
|---|---|---|---|---|
| শস্য ঋণ | ৫০,০০০ | ৫০ লক্ষ | ৮-৯ | ১ |
| মৎস্য ঋণ | ১ লক্ষ | ২ কোটি | ৮ | ৩-৫ |
| লাইভস্টক ঋণ | ২০,০০০ (প্রতি পশু) | ১ কোটি | ৮.৭৫ | ২-৪ |
| সেচ যন্ত্রপাত ঋণ | ২ লক্ষ | ১ কোটি | ৮ | ৫-৭ |
| পার্সোনাল লোন | ১ লক্ষ | ৩০ লক্ষ | ৮.৭৫ | ৭ |
উদাহরণস্বরূপ, একজন ছোট কৃষক ধান চাষের জন্য ২ লক্ষ টাকা লোন নিতে পারেন, যা ফসল বিক্রির পর একবারে শোধ করতে হবে। বড় কৃষকরা ক্লাস্টার প্রকল্পে ১০ কোটি পর্যন্ত পেতে পারেন। এই টেবিলটি বিকেবির অফিসিয়াল নির্দেশিকা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।
লোনের জন্য যোগ্যতা এবং আবেদন প্রক্রিয়া
লোন পাওয়ার জন্য আপনাকে কিছু মৌলিক যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। নিচের লিস্টে সেগুলো উল্লেখ করা হলো:
- বয়স: কমপক্ষে ১৮ বছর, সর্বোচ্চ ৬৫ বছর।
- আয়ের প্রমাণ: কৃষি-সম্পর্কিত আয়ের দলিল, যেমন জমির খতিয়ান বা পূর্ববর্তী ফসলের রেকর্ড।
- কল্যাণগ্রস্ত নয়: ডিফল্টার লিস্টে নাম না থাকা।
- স্থানীয়: বাংলাদেশের নাগরিক এবং বিকেবির শাখা এলাকায় বসবাস।
- প্রকল্প পরিকল্পনা: লোনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে লিখিত প্রস্তাবনা।
আবেদন প্রক্রিয়া সহজ:
- নিকটস্থ বিকেবি শাখায় যান বা BKB Janala অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
- ফর্ম পূরণ করুন এবং প্রয়োজনীয় দলিল (জাতীয় পরিচয়পত্র, জমির কাগজ) জমা দিন।
- শাখা কর্মকর্তা যাচাই করে অনুমোদন দেবেন, যা ১৫-৩০ দিন লাগতে পারে।
- অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে ট্র্যাক করুন।
এই প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড হওয়ায় এখন আরও সহজ হয়েছে।
সুদের হার এবং শোধের নিয়ম
বিকেবির সুদের হার বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ে কম, যা কৃষকদের জন্য সুবিধাজনক। বর্তমানে (২০২৫ অনুযায়ী) গড় হার ৮% থেকে ৮.৭৫%। উদাহরণ: ১ লক্ষ টাকার লোন নিলে বছরে ৮,০০০ টাকা সুদ দিতে হবে। শোধ এককালীন বা কিস্তিতে, ফসল বিক্রির সাথে যুক্ত। দেরিতে শোধ করলে জরিমানা যোগ হয়।
কৃষি লোনের সুবিধা এবং সতর্কতা
কৃষি লোন নেওয়ার সুবিধা অনেক: সস্তা সুদ, দ্রুত প্রক্রিয়া এবং কোনো কোল্যাটারাল ছাড়াই ছোট লোন। তবে সতর্কতা অবলম্বন করুন – লোনের পরিমাণ অতিরিক্ত না নেওয়া এবং সময়মতো শোধ করা। ব্যাংকটির লোকসানের খবর থাকলেও, সরকারি সহায়তায় এটি স্থিতিশীল।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (এফএকিউ)
কৃষি ব্যাংক কত টাকা লোন দেয় ছোট কৃষকদের জন্য?
সাধারণত ৫০,০০০ থেকে ৫ লক্ষ টাকা, প্রকল্প অনুসারে।
লোনের সুদের হার কত?
৮% থেকে ৯%, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে।
অনলাইনে লোন আবেদন করা যায় কি?
হ্যাঁ, BKB Janala অ্যাপের মাধ্যমে।
লোন না শোধ করলে কী হয়?
জরিমানা এবং ক্রেডিট স্কোর খারাপ হয়, পরবর্তী লোন বন্ধ হতে পারে।
নারী কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা আছে কি?
হ্যাঁ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সিএমএসএমই লোন প্যাকেজ রয়েছে।
শেষ কথা
কৃষি ব্যাংকের লোন কৃষকদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সঠিক পরিকল্পনা করে আবেদন করলে আপনার কৃষি জীবন আরও সমৃদ্ধ হবে। আরও তথ্যের জন্য নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ করুন – সফলতা আপনার অপেক্ষায়!








